কোপার্নিকাসের মূলনীতি



 

সুপ্রাচীনকাল থেকেই মানুষ নিজেদেরকে সবকিছুর কেন্দ্রে মনে করত ! মানে স্থান , কাল , ঘটনা সকলকিছুর ...সবসময় মানুষের জীবনকালকেই প্রাধান্য দিয়ে জগতের ক্রিয়াকলাপ ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হত ! এনাক্সিমেন্ডার (৬১০-৫৪৬ খ্রিস্টপূর্বের) একজন গ্রিক দার্শনিক। সৃষ্টিতত্ত্বে তার অবদানের জন্য তাকে অনেকেসৃষ্টিতত্ত্বের জনক মনে কর থাকেন।এনাক্সিমেন্ডার সর্বপ্রথম একটি স্বয়ংক্রিয় মহাবিশ্বের ধারণা প্রদান করেন। তার মডেলে পৃথিবীকে মহাবিশ্বের কেন্দ্রে শূণ্যে ভাসমান এবং স্থির হিসেবে দেখানো হয়। তবে তিনি পৃথিবীকে গোলাকার না মনে করে সিলিন্ডার আকৃতির মনে করেন। তার মডেলটি এজন্য বিখ্যাত, কারণ শূণ্যে ভাসমান ধারণাটির মাধ্যমে তিনি আকাশের বস্তুর পৃথিবীর নিচ দিয়ে যাবার ধারণাটি প্রচলনের পথ সুগম করেন।

গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টোকার্স অব সামোস, অ্যারিস্টোটল এবং টলেমি মহাবিশ্ব সম্পর্কে বিভিন্ন ধারণা প্রদান করেছেন।তাঁদের মডেলে পৃথিবীই মহাবিশ্বের কেন্দ্রে অবস্থিত এবং পৃথিবীকে কেন্দ্র করে সমস্ত গ্রহ, সূর্য নক্ষত্ররা ঘুরছে। গ্রীকদের এই মডেলে মহাবিশ্বের মোট আয়তন বর্তমানে জ্ঞাত বৃহস্পতি গ্রহের কক্ষপথের মধ্যেই ছিল। তাঁরা ভেবেছিলেন আকাশের তারারা আমাদের থেকে খুব বেশি দূরে অবস্থিত নয়। টলেমির ভূ-কেন্দ্রিক (পৃথিবীর মহাবিশ্বের কেন্দ্রে অবস্থানের) ধারণা প্রায় ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ধারণা ছিল। তবে, গ্রীক দার্শনিক ফিলোলাস (খৃ:পূ: ৪৭০-৩৮৫) এবং অ্যারিস্টোকার্স পৃথিবীর মহাবিশ্বের কেন্দ্রে অবস্থানের ধারণার বিরোধিতা করেছিলেন।

ভূ-কেন্দ্রিক মডেলে পৃথিবীই মহাবিশ্বের কেন্দ্রে অবস্থিত এবং পৃথিবীকে কেন্দ্র করে সমস্ত গ্রহ, সূর্য নক্ষত্ররা ঘুরছে বলে ধরে নেয়া হয়েছিল। এর পেছনে কারণ ছিল, পৃথিবী থেকে সূর্য, চাঁদ অন্যান্য গ্রহের গতি দেখলে মনে হয় পৃথিবী নয়, সূর্য, চাঁদ অন্যান্য গ্রহসমূহ পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। প্রাচীন গ্রিক, রোমান এবং মধ্যযুগের দার্শনিকগণ ভূ-কেন্দ্রিক মডেলে পৃথিবীকে একটি গোলকের সাথে তুলনা করেন। প্রাচীন গ্রিকগণ বিশ্বাস করতেন যে গ্রহসমূহের গতি বৃত্তীয়, সে ধারণাকে সপ্তদশ শতাব্দীর আগ পর্যন্ত কেউ চ্যালেঞ্জ ককরতে পারেনি।

খৃষ্টপূর্ব ৪র্থ শতকে গ্রিসে সর্বস্তরে ভূ-কেন্দ্রিক ধারণাটি গ্রহণযোগ্যতা পায়। এর প্রমাণ প্লেটো-এরিস্টটল দের লেখা থেকে পাওয়া যায়। প্লেটো পৃথিবীর গোলককে মহাবিশ্বের কেন্দ্রে স্থান দিয়েছিলেন। ইউডোক্সাস এর সাথে গ্রহ সমূহের গতি যোগ করে একটি মডেল তৈরি করেন। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে সিডিয়াসের ইউডক্সাস এবং সাইপ্রাসের কলিপ্পস প্রথম জ্যামিতিক, ত্রিমাত্রিক মডেলের মাধ্যমে গ্রহগুলির আপাত গতির ব্যাখ্যা করেছিলেন। তাদের মডেল পৃথিবী কেন্দ্রিক নেস্টেড homocentric গোলক উপর ভিত্তি করে ছিল। তাদের কনিষ্ঠ সমসাময়িক হেরাক্লাইডস পন্টিকাস প্রস্তাব করেছিল যে পৃথিবী তার অক্ষকে কেন্দ্র করে ঘুরছে।এরিস্টটল কে আমরা সবাই জানি, বিশ্ববিখ্যাত গ্রিক বিজ্ঞানী দার্শনিক তাকে প্রাণীবিজ্ঞানের জনক বলা হয় এরিস্টটলের রচনাবলী শুধুমাত্র তার সময়েই প্রভাব বিস্তারকারী ছিলনা, বরং নিউটনের আগ পর্যন্ত, পরবর্তী দুই হাজার বছর ধরে সমস্ত বিজ্ঞানের ভিত্তিমূল হিসাবে স্বীকৃত ছিল দর্শন, যুক্তি, জোতির্বিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞানসহ অসংখ্য বিষয়ে লিখে গেছেন তিনি

খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতাব্দী (৩১০-২৩০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) সামোস-এর অ্যারিস্টোকার্স (Aristarchus of Samos) একটি সূর্যকেন্দ্রিক মহাবিশ্বের প্রস্তাব করেন। তিনিই প্রথম উল্লেখ করেন পৃথিবী নিজের অক্ষের উপর এবং সূর্যের চারিদিকে ঘুরছে। অ্যারিস্টোকার্স তার পূর্ববর্তী দার্শনিক ফিলোলাসেরকেন্দ্রীয় অগ্নি তত্ত্ব দ্বারা অনুপ্রাণিত হন। তিনিকেন্দ্রীয় অগ্নি জায়গায় সূর্যকে উপস্থাপন করেন এবং গ্রহসমূহকে সূর্য হতে দূরত্ব অনুযায়ী সঠিক অবস্থানে স্থাপন করেন। এনাক্সাগোরাসের মত তিনিও মনে করতেন যে আকাশের তারাগুলোও একেকটি সূর্য যা কিনা অনেক অনেক দূরে অবস্থান করছে। তিনি অবশ্য পৃথিবীর নিজ অক্ষকে কেন্দ্র করে ঘোরার ধারণাটা বাতিল করে দেন। অ্যারিস্টোকার্স ভূ-কেন্দ্রিক মতবাদের বিকল্প হিসেবে এই সৌরকেন্দ্রিক ধারণা প্রদান করেন। অ্যারিস্টটল টলেমীর মতবাদ তৎকালীন ধর্মীয় গ্রন্থের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ায় তা এতটা শক্তিশালি ছিল এবং ইউরোপে অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগ নেমে এসেছিল যে ভুকেন্দ্রিক মহাবিশ্বের তথা জগত ব্যাবস্থার বিরুদ্ধে আর কেউ মাথা তুলে কথা বলতে পারেন নি ! তিনি গাণিতিকভাবে জ্যোতির্বিজ্ঞান অধ্যয়ন করেন এবং জ্যামিতিক পদ্ধতির সাহায্যে চন্দ্র সূর্যের আপেক্ষিক আকার এবং পৃথিবী থেকে এদের আপেক্ষিক দূরত্ব নির্ণয় করেন। তিনি নির্ণয় করেছিলেন সূর্য চাঁদ অপেক্ষা ১৮-২০ গুণ দূরে অবস্থিত (প্রকৃতপক্ষে ৪০০ গুণ দূরে অবস্থিত) নিয়ে আমাদের পোস্ট আছে !

তার পর এলেন কোপারনিকাস ! নিকোলাস কোপার্নিকাস তার বইদি রিভিউলশনিবাস ওরিবিয়াম কোলেস্টিয়াম তার মৃত্যুর আগে প্রকাশ করেন ১৫৪৩ সালে। যদিও তিনি ১৫১০ সালে গাণিতিকভাবে তত্ত্বটি তৈরী করেন। কোপার্নিকাসের হেলিওসেন্ট্রিক তত্ত্বের সারাংশ নিম্নে দেয়া হল।

- মহাবিশ্বের কেন্দ্র বলে কিছু নেই।

- পৃথিবীর কেন্দ্র মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয়।

- প্রতিটি গ্রহ উপগ্রহের মধ্যবিন্দু সূর্য, তাই সূর্যই মহাবিশ্বের কেন্দ্র।

- সূর্য থেকে মহাকাশের উচ্চতা পর্যন্ত পৃথিবীর দূরত্ব অনুপস্থিত(মহাবিশ্বের বাইরের সর্বোচ্চ মহাজাগতিক তল) সূর্য থেকে পৃথিবীর ব্যাসার্ধের দুরত্বের তুলনায় এতো ছোট যে পৃথিবী থেকে সূর্য পর্যন্ত দুরত্ব স্থল উচতার তুলনায় অপ্রত্যাশিত।

-মহাবিশ্বের গতির কোন নতুন আবির্ভাব হয় না। পৃথিবী তার উপাদানগুলোর সাথে একটি নির্দিষ্ট গতিতে ঘুরতে থাকে।

- আমরা যা দেখতে পাই তা আসলে সূর্যের গতি নয়, আমরা পৃথিবীর এর উপগ্রহের গতিপথ লক্ষ্য করতে পারি।

- গ্রহ উপগ্রহের গতি পৃথিবী থেকেই উৎপন্ন। তাই পৃথিবীর গতি বর্ণনা ক্রলে কোন বিন্দুর গণনা করার প্রয়োজন হয় না

তার এই তত্ত্ব মুলত স্থানিকভাবে কোপারনিকান মূলনীতি নামে পরিচিত

Post a Comment

Previous Post Next Post